ডেবিট ও ক্রেডিট: ১২টি লেনদেন দিয়ে হিসাব বোঝা

ডেবিট (Debit) হলো হিসাবের বাম পাশ, ক্রেডিট (Credit) ডান পাশ। কোন পাশে বৃদ্ধি লিখবে, তা নির্ভর করে হিসাবের ধরনের ওপর। নগদ বেড়ে গেলে ডেবিট হয়; মূলধন বেড়ে গেলে ক্রেডিট হয়। তাই শুধু টাকা এসেছে বা গেছে দেখে জাবেদা করলে ভুল হতে পারে।

এই গাইডে একটি ছোট সেবা ব্যবসায়ের ১২টি কাল্পনিক লেনদেন বিশ্লেষণ করব। কোনো বোর্ড প্রশ্ন হুবহু নেওয়া হয়নি। পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে মজুদ হিসাবের পদ্ধতি অনুযায়ী অতিরিক্ত দাখিলা লাগতে পারে; এখানে সেই জটিলতা এড়াতে সেবা ব্যবসায় নেওয়া হয়েছে।

আগে হিসাবের ধরন চিনে নাও

সাধারণ হিসাবের ডেবিট ও ক্রেডিট
হিসাবের ধরন বৃদ্ধি হ্রাস উদাহরণ
সম্পদ ডেবিট ক্রেডিট নগদ, ব্যাংক, আসবাবপত্র, দেনাদার
দায় ক্রেডিট ডেবিট পাওনাদার, ঋণ
মালিকের মূলধন ক্রেডিট ডেবিট ব্যবসায় মালিকের বিনিয়োগ
আয় ক্রেডিট ডেবিট সেবা আয়
ব্যয় ডেবিট ক্রেডিট ভাড়া, বেতন, বিদ্যুৎ ব্যয়
উত্তোলন ডেবিট ক্রেডিট মালিকের ব্যক্তিগত কাজে নেওয়া টাকা

হিসাব সমীকরণ হলো: সম্পদ = দায় + মালিকানা স্বত্ব। ব্যয় ও উত্তোলন মালিকানা স্বত্ব কমায়, আয় তা বাড়ায়। উপরের ছক সাধারণ হিসাবের জন্য; বিপরীত হিসাব বা বিশেষ সমন্বয়ের ক্ষেত্রে নিজের বইয়ের ব্যাখ্যা মিলিয়ে নেবে।

জাবেদা করার সময় চারটি প্রশ্ন

  1. ব্যবসায়ের কোন কোন হিসাব বদলেছে?
  2. প্রতিটি হিসাব সম্পদ, দায়, মূলধন, আয়, ব্যয়, নাকি উত্তোলন?
  3. প্রতিটি হিসাবের পরিমাণ বেড়েছে, নাকি কমেছে?
  4. মোট ডেবিট এবং মোট ক্রেডিট সমান হয়েছে কি?

ধরা যাক, মালিক ৫০,০০০ টাকা দিয়ে ব্যবসায় শুরু করেছেন। নগদ সম্পদ বেড়েছে, তাই নগদ ডেবিট। মূলধনও বেড়েছে, তাই মূলধন ক্রেডিট। এখানে নগদ ডেবিট হওয়ার কারণ শুধু টাকা পাওয়া নয়, সম্পদ বৃদ্ধি পাওয়া।

১২টি লেনদেন ও তার দাখিলা

রাফির ছোট প্রিন্টিং সেবা ব্যবসায়ের হিসাব নিয়ে নিচের উদাহরণগুলো তৈরি করা হয়েছে। সব অঙ্ক টাকায়। প্রতিটি ক্ষেত্রে ডেবিটের হিসাব আগে, ক্রেডিটের হিসাব পরে লেখা হয়েছে।

১. নগদ মূলধন দিয়ে শুরু

রাফি ৫০,০০০ টাকা বিনিয়োগ করলেন। নগদ হিসাব ডেবিট ৫০,০০০; মূলধন হিসাব ক্রেডিট ৫০,০০০। ব্যবসায়ের সম্পদ এবং মালিকের দাবি একই পরিমাণ বাড়ল।

২. নগদে আসবাবপত্র কেনা

৮,০০০ টাকার আসবাবপত্র কেনা হলো। আসবাবপত্র হিসাব ডেবিট ৮,০০০; নগদ হিসাব ক্রেডিট ৮,০০০। একটি সম্পদ বাড়ল, অন্যটি কমল। দীর্ঘদিন ব্যবহার করার আসবাবকে এই উদাহরণে তাৎক্ষণিক ভাড়া ব্যয়ের মতো ধরা হচ্ছে না।

৩. বাকিতে যন্ত্রপাতি কেনা

সরবরাহকারীর কাছ থেকে ১২,০০০ টাকার যন্ত্রপাতি পাওয়া গেল, টাকা পরে দেওয়া হবে। যন্ত্রপাতি হিসাব ডেবিট ১২,০০০; পাওনাদার হিসাব ক্রেডিট ১২,০০০। সম্পদ এসেছে এবং পরিশোধের দায় তৈরি হয়েছে। শুধু অর্ডার দিলে, সরবরাহ না পেলে, এই একই দাখিলা ধরে নেওয়া যাবে না।

৪. নগদে সেবা দেওয়া

কাজ শেষ করে ৬,০০০ টাকা পাওয়া গেল। নগদ হিসাব ডেবিট ৬,০০০; সেবা আয় হিসাব ক্রেডিট ৬,০০০। সেবা সম্পন্ন হওয়ায় আয় হয়েছে।

৫. বাকিতে সেবা দেওয়া

৪,০০০ টাকার কাজ শেষ হয়েছে, গ্রাহক পরে পরিশোধ করবেন। দেনাদার হিসাব ডেবিট ৪,০০০; সেবা আয় হিসাব ক্রেডিট ৪,০০০। টাকা হাতে না এলেও ব্যবসায়ের পাওনা এবং অর্জিত আয় তৈরি হয়েছে।

৬. দেনাদারের কাছ থেকে টাকা আদায়

আগের গ্রাহকের কাছ থেকে ২,৫০০ টাকা পাওয়া গেল। নগদ হিসাব ডেবিট ২,৫০০; দেনাদার হিসাব ক্রেডিট ২,৫০০। আবার সেবা আয় ক্রেডিট করলে একই আয় দুবার লেখা হবে। এখন শুধু পাওনা কমেছে।

৭. পাওনাদারকে পরিশোধ

যন্ত্রপাতির সরবরাহকারীকে ৫,০০০ টাকা দেওয়া হলো। পাওনাদার হিসাব ডেবিট ৫,০০০; নগদ হিসাব ক্রেডিট ৫,০০০। দায় কমেছে বলে পাওনাদার ডেবিট হয়েছে।

৮. চলতি মাসের ভাড়া

দোকান ভাড়া ৩,০০০ টাকা দেওয়া হলো। ভাড়া ব্যয় হিসাব ডেবিট ৩,০০০; নগদ হিসাব ক্রেডিট ৩,০০০। এখানে চলতি মাসের ব্যবহারের ব্যয় ধরা হয়েছে, অগ্রিম ভাড়া নয়।

৯. বেতন দেওয়া

সহকারীকে ২,০০০ টাকা বেতন দেওয়া হলো। বেতন ব্যয় হিসাব ডেবিট ২,০০০; নগদ হিসাব ক্রেডিট ২,০০০। ব্যয় বাড়ছে এবং নগদ কমছে।

১০. মালিকের ব্যক্তিগত উত্তোলন

রাফি নিজের কাজে ১,৫০০ টাকা নিলেন। উত্তোলন হিসাব ডেবিট ১,৫০০; নগদ হিসাব ক্রেডিট ১,৫০০। ব্যক্তিগত খরচ ব্যবসায়ের বেতন বা ভাড়া ব্যয় নয়।

১১. ব্যাংকঋণ নেওয়া

ব্যবসায়ের ব্যাংক হিসাবে ঋণের ১০,০০০ টাকা জমা হলো। ব্যাংক হিসাব ডেবিট ১০,০০০; ব্যাংকঋণ হিসাব ক্রেডিট ১০,০০০। ঋণ ব্যবসায়ের আয় নয়, ফেরত দেওয়ার দায়।

১২. ঋণের আসল ও সুদ একসঙ্গে পরিশোধ

ব্যাংক থেকে ২,০০০ টাকা ঋণের আসল এবং ২০০ টাকা সুদ দেওয়া হলো। ব্যাংকঋণ হিসাব ডেবিট ২,০০০; সুদ ব্যয় হিসাব ডেবিট ২০০; ব্যাংক হিসাব ক্রেডিট ২,২০০। মোট ডেবিট ২,২০০ এবং মোট ক্রেডিট ২,২০০। এক দাখিলায় দুইটি ডেবিট থাকতে পারে।

নিজের হিসাব যাচাই করো

এই ১২টি লেনদেন শেষে নগদ ৩৮,৫০০, ব্যাংক ৭,৮০০, আসবাবপত্র ৮,০০০, যন্ত্রপাতি ১২,০০০ এবং দেনাদার ১,৫০০ টাকা। মোট সম্পদ ৬৭,৮০০ টাকা। পাওনাদার ৭,০০০ এবং ঋণ ৮,০০০ টাকা, মোট দায় ১৫,০০০।

আয় ১০,০০০ এবং ব্যয় ৫,২০০ টাকা হওয়ায় লাভ ৪,৮০০। মূলধন ৫০,০০০ + লাভ ৪,৮০০ − উত্তোলন ১,৫০০ = মালিকানা স্বত্ব ৫৩,৩০০ টাকা। ফলে ৬৭,৮০০ = ১৫,০০০ + ৫৩,৩০০। এই যাচাই কাজে লাগে, তবে ডেবিট ও ক্রেডিট সমান হলেই প্রতিটি হিসাবের নাম ঠিক হয়েছে এমন নিশ্চয়তা নেই।

খাতা বন্ধ করে তিনটি অনুশীলন

  1. মালিক আরও ৭,০০০ টাকা নগদ বিনিয়োগ করলেন।
  2. দেনাদারের কাছ থেকে আগের পাওনার ১,০০০ টাকা পাওয়া গেল।
  3. ব্যাংক থেকে ঋণের আসল ১,০০০ ও সুদ ৮০ টাকা দেওয়া হলো।
উত্তর ও কারণ দেখো
  1. নগদ ডেবিট ৭,০০০; মূলধন ক্রেডিট ৭,০০০। সম্পদ ও মূলধন বৃদ্ধি।
  2. নগদ ডেবিট ১,০০০; দেনাদার ক্রেডিট ১,০০০। পাওনা আদায়, নতুন আয় নয়।
  3. ব্যাংকঋণ ডেবিট ১,০০০; সুদ ব্যয় ডেবিট ৮০; ব্যাংক ক্রেডিট ১,০৮০। আসল দায় কমায়, সুদ ব্যয় বাড়ায়।

ভুল হলে শুধু সঠিক দাখিলা লিখে থেমো না। কোন হিসাবের ধরন ভুল ধরেছিলে, সেটি পাশে লিখে রাখো। পরের দিন একই ধরনের দুইটি নতুন লেনদেন তৈরি করে সমাধান করো।

পড়ার সূত্র ও পরের কাজ

হিসাব সমীকরণ ও লেনদেন বিশ্লেষণের ধারণা যাচাই করতে OpenStax-এর Financial Accounting, অধ্যায় ৩.৪ দেখা হয়েছে। এই গাইডের অঙ্ক, ব্যবসায় ও অনুশীলন নিজস্ব। SSC-এর খাতায় হিসাবের নাম ও দাখিলার বিন্যাস তোমার প্রযোজ্য NCTB হিসাববিজ্ঞান বই এবং শিক্ষকের নির্দেশনার সঙ্গে মিলিয়ে নেবে।

আরও অনুশীলনের জন্য নিজের ব্যাচের SSC 2027 হিসাববিজ্ঞান ক্লাস বা SSC 2028 হিসাববিজ্ঞান ক্লাস দেখো। বিষয়গুলো তিন বিষয়ের ব্যবসায় শিক্ষা বান্ডলের অংশ। পড়া ভাগ করতে সাপ্তাহিক পড়ার রুটিন ব্যবহার করতে পারো।

Scroll to Top